বেশ আরাম আয়েশি এবং বিলাসী জীবন ছিল এই মধ্যবয়সী নারীর। সময় কাটতো অনেকটা আমোদ প্রমোদেই। তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন পাঁচতারা হোটেলের বিলাসবহুল সজ্জিত ঘরে। সুন্দরী সব তরুণীরা তার দেখভাল করার জন্য ঘিরে থাকতো তাকে নিয়ে। তিনি মেতে থাকতেন সমাজের উঁচু স্তরের ’এলিট’ শ্রেণির মানুষ নিয়ে তাছাড়া অপেক্ষায় থাকতেন তাদের। তাদের সবসময় আমোদিত করাই ছিল তার সার্বক্ষনিক কাজ। ইনি আর কেউ নন, বলছিলাম কয়েকমাস আগের আলোচিত চরিত্র এবং যুব মহিলা লীগের সাবেক নেত্রী শামীমা নূর পা/পিয়ার কথা।
অনেকটা রাতারাতিই বদলে গিয়েছিল অন্ধকার পৃথিবীর ’লেডি ডন’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া পাপিয়ার জীবন। সেই পাঁচতারা হোটেল এবং সেখানকার বিলাসবহুল জীবন এবং কক্ষ তার কাছে পুরোপুরি দিবাস্বপ্ন। বিলাসী জীবন আর নেই, দুঃসপ্ব ঘিরে রয়েছে এখন তাঁকে। এই পরিপাটি নারীর সূর্য ওঠে এখন কা/রাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে, দেখতে পারে না সন্ধ্যাতারা বা বিকেলের হেলে যাওয়া সূর্য। গারদের লোহা বেষ্টিত দেয়াল, তার কাছে এখন দুঃস্বপ্নই বটে।

কা/রাগারের ব/ন্দি জীবনে অতীত পাপের খেসারত দিচ্ছেন পাপিয়া। সময় চলছে কচ্ছপের পিঠে চড়ে। আচরণে কোনো অনুতাপ নেই। নেই অহমিকা। চলাফেরায় ভাবলেশহীন। নির্লিপ্ত দিনযাপন। এমনই তথ্য মিলেছে কারাসূত্রের সঙ্গে আলাপে।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে র‌্যাবের রি/মান্ডের মাঝপথে তাকে কাশিমপুর কারাগারের হাজতে পাঠানো হয়। তিনটি মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও পা/পিয়ার আরও ১০ দিনের রিমান্ডের অপেক্ষা।

কারাগার সূত্রে জানা যায়, নিঃসঙ্গ জীবনে পাপিয়ার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। সংবেদনশীল আসামি হওয়ায় বন্দি সেলে পাপিয়ার কারও সঙ্গে সেভাবে মেলামেশার সুযোগ নেই। তাকে আলাদাই রাখা হয়েছে। কারাগারে আসার পর থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি।

এদিকে পা/পিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে এনে আরও একটি মামলা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি এই মামলাটি করেছে। তবে, করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সেটার তদন্ত কাজ স্থগিত হয়ে আছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা। এই নিয়ে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হলো।

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের (বর্তমানে আজীবন বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পা/পিয়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্বামী মফিজুর রহমান সুমন, দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও কাজী তায়্যিবা নূরসহ দেশত্যাগের সময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‌্যাবের হাতে গ্রে/প্তার হন। ধরা পড়ার পর তাকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অ/স্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা করে র‌্যা/ব।

যুবলীগের এই নেত্রী (পরে বহিষ্কৃত) গ্রেপ্তারের আগে গুলশানের অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া নিয়ে মাসে বিল গুনতেন কোটি টাকা। সব সময় সঙ্গে থাকত সাতজন অল্পবয়সী তরুণী। আর আনাগোনা ছিল সমাজের নানা পর্যায়ের ’এলিট’ মানুষের।

কারাগার সূত্রটি জানিয়েছে, সংবেদনশীল আসামি হওয়ায় পা/পিয়াকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশেষ একটি সেলে। তার সঙ্গে আর কোনো বন্দি নেই। দিন-রাত একাকি কাটে ছোট্ট ঘরের চার দেয়ালে। মাঝে মধ্যে বই পড়েন। বাকি সময় শুয়ে-বসে আর ঘুমিয়েই কাটান একসময়ের পাঁচতারকা হোটেলের বিলাসী গ্রাহক পা/পিয়া। তাছাড়া করোনাভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য আপাতত এই কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

এত অপ/কর্মে লিপ্ত থাকলেও পাপিয়ার মধ্যে তেমন কোনো অনুশোচনার লক্ষণ নেই বলে জানায় কারাসূত্র। তারা বলছে, তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বোধ নেই। তবে মাঝেমধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন। বিলাসবহুল চলাচলে অভ্যস্থ পা/পিয়া এই বন্দি পরিবেশ মানিয়ে নিতে প্রথমে কষ্টই করেছেন।

এদিকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আনোয়ার রিপন জানান, পাপি/য়ার শারীরিক পরিস্থিতি ভালো আছে এবং তিনি সুস্থ আছেন। কোনো সমস্যা নেই। আমরা নিয়মিত তার খোঁজ রাখি।

র‌্যাব জানিয়েছে, তিনটি মামলায় পাপি/য়ার ১৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিল আদালত। গত ১৬ মার্চ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনে র‌্যাব। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ায় তাকে পাঁচ দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ২০ মার্চ কারাগারে পাঠানো হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

পাপি/য়ার কাছ থেকে যা উদ্ধার হয়:

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে পাসপোর্ট, নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা, জাল টাকা, ১১ হাজার ৪৮১ ইউএস ডলার, ৩০১ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান রুপি উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করে র‌্যাব।

পরে পাপি/য়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে একটি অ/বৈধ অ/স্ত্র, দুটি পিস্ত/লের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্ত/লের গু/লি, পাঁচ বোতল বিদেশি ম/দ, নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় শেরেবাংলানগর থানায় পাপি/য়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অ/স্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মাম/লা করে র‌্যাব।

বহিস্কৃত এই যুবলীগ নেত্রীকে গ্রেপ্তারের পর তথ্য বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট সাড়ে ৪ মাস ধরে ভাড়া ছিল পাপি/য়ার কাছে। এ সময়ে হোটেলটির কক্ষ ভাড়া, মদের বিল, খাবারের খরচসহ আনুষঙ্গিক মোট বিল হয়েছিল তিন কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন হোটেলের বিল বাবদ গড়ে খরচ করেন আড়াই লাখ টাকা। তরুণীদের অনৈ/তিক ব্যবহার, অ/স্ত্র, মা/দক, চো/রাচালান, জা/ল নোটের কারবার, চাঁদা/বাজি, তদবির-বাণিজ্য, জায়গাজমি দ/খল-বেদখল ও অ/নৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হন পাপি/য়া ও সুমন দম্পতি।


পাপিয়া মেয়েদেরকে অনৈ/তিক কাজে বাধ্য করেছিল। তিনি অ/স্ত্র ও মা/দকের ব্যবসায়ের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি নরসিংদীতে একটি দাতব্য সংস্থা চালু করেছিলেন এবং দরিদ্র মহিলাদের সেখান থেকে এনে ব্যবসায় ব্যবহার করেছিলেন। নরসিংদীতে তার একটি ট/র্চার সেলও ছিল। রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের একটি প্রেসিডেন্ট স্যুট দীর্ঘদিন ধরে তার নামে বুকিং থাকতো। পাপি/য়ার স্বামী সুমন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তাদের অটোমোবাইল ব্যবসা রয়েছে। তিনি তার স্ত্রীকে তার অ/বৈধ কাজে সহায়তা করেছিলেন। থাইল্যান্ডেও তিনি ছিলেন একটি বারের মালিক। যদিও গাড়িচালিত ব্যবসায় থেকে তার বার্ষিক আয় ১৯ লাখ টাকা হলেও রেকর্ডে বলা হয়েছে যে তিনি কেবল ঢাকার ওয়েস্টিনের বারে আড়াই লাখ টাকারও বেশি অর্থ প্রদান করেন প্রতিদিন।