বেকারদের কর্ম, ভাগ্যান্বেষীদের ভাগ্য ফেরানোর আশা, বিদ্যান্বেষীসহ উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য নানা স্তরের এবং শ্রেনীর মানুষদের `স্বপ্ন গড়ার শহর’ ছিল ঢাকা। সেকারনে দিনের পর দিন এই শহরে মানুষ বেড়ে চলছিল জ্যামিতিক হারে যা করে তুলেছিল এই রাজধানী ঢাকাকে পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। কিন্তু গত মার্চের দিকে দেশে করোনাভাইরাস হানা দেয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর থেকে সেই আশা নিয়ে আসা মানুষদের স্বপ্ন ভাঙতে শুরু করে এই ঢাকা শহরে। শুধু ঢাকা নয়। সারা দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে বসবাসকারী চাকুরে কিং অন্য সকল ধরনের পেশের মানুষের গত ক’মাসে আয় রোজগার কমে যায় অকল্পনীয়ভাবে। কর্ম হারিয়েছে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। জমানো টাকা শেষ অনেকের। হতদরিদ্ররা ছিল যারা তারা হয়ে পড়েছে অসহায় এবং সম্বলহীন। জীবিকার এমন সংকটময় সময়ে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে আরম্ভ করেছে মানুষ। তাতে করে যে সকল বাসা পাওয়া একসময় দুরূহ ছিল বাসা খোজা মানুষের সেখানে সেই বাসাগুলোতে শোভা পাচ্ছে টু-লেট। বাড়িতে বাড়িতে ঝুলতে শুরু করছে বাসা ভাড়া দেয়ার বিজ্ঞাপন ’টু লেট’।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের কর্মসংস্থানের সিংহভাগ রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন কাজের সন্ধানে রাজধানীমুখী হতেন। প্রতিদিনই কর্মসংস্থান বা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঢাকায় আসতেন মানুষ। এভাবে দেড় হাজার বর্গকিলোমিটারের এ নগরীর বাসিন্দার সংখ্যা দাঁড়িয়ে যায় প্রায় দুই কোটি, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ভাড়া বাসার বাসিন্দা। এ ভাড়াটিয়ারা বছরের পর বছর বাসার উচ্চ ভাড়া দিয়ে আসছেন। কিন্তু করোনাভাইরাস পরবর্তী পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে বাসা ভাড়ার চিত্রও। করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেক মানুষের শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে অনেক মানুষ হতদরিদ্র হয়েছেন, যার ফলে আগের ভাড়ার ভার বইতে পারছেন না তারা, ফলে ছেড়ে দিচ্ছেন বাসা, ছেড়ে দিচ্ছেন ঢাকাও।

করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখে গেছে, বেশিরভাগ বাড়িতেই দু-একটা ফ্ল্যাট ফাঁকা আছে। ভাড়াটিয়া চেয়ে ’টু লেট’লেখা বিজ্ঞাপন সাঁটানো থাকলেও বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না। দু-একটি ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মধ্যেই বাড়ির মালিককে বাসা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছেন আরও অনেক ভাড়াটিয়া।

বেশিরভাগ বাড়িতে ’টু লেট’ বিজ্ঞাপনের হেতু জানতে রাজধানীর বেশ কিছু বাড়ি মালিকের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তারা জানান, সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের কারণে অনেকেই তাদের পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরিবারের উপার্জনের ব্যক্তিটি পরে বাসা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো মেস বা ছোট বাসায় উঠেছেন, যে কারণে অনেক বাসা ফাঁকা হয়ে গেছে। এছাড়া এই পরিস্থিতিতে নতুন কেউ বাসা পরিবর্তন করেননি এবং জীবিকার তাগিদে ঢাকায় নতুন মানুষও তেমন একটা আসেননি। যে কারণে বাসাগুলো ফাঁকা রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে ঠিক মত বেতন না পাওয়া, কাজ না থাকা, এমনকি চাকরি হারানোই বড় কারণ।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একটি বাড়ির মালিক জয়নাল হক বলেন, আমার পাঁচতলা বাড়ির দুটি ফ্ল্যাট গত দুই মাস ধরে ফাঁকা। আগে ’টু লেট’ সাঁটানোর সাতদিনের মধ্যে বাসা ভাড়া হয়ে যেত। কিন্তু এখন ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।

আশপাশে আরও কিছু বাড়িতে এভাবে ’টু লেট’ বিজ্ঞাপন ঝুলছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। অনেকে পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে কোনো মেসে উঠেছেন। অনেকের ইনকাম কমে গেছে, যে কারণে আগে ১৬ হাজার টাকার বাড়িতে থাকলেও এখন ১০ হাজার টাকা ভাড়ার বাসায় চলে যেতে চাচ্ছেন। অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তেমন ব্যবসা না হওয়ায় পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। অনেকের ইনকাম না থাকায় দুই মাস ধরে বাসা ভাড়া দিতে পারেননি। যে কারণে বাড়ির মালিক রাগে তাদের বের হয়ে যেতে বলে ’টু লেট’ টাঙিয়েছেন। সব মিলিয়ে এখন রাজধানীর অনেক বাড়িতেই দু-একটি ফ্ল্যাট ফাঁকা রয়েছে।

তবে বাড়ির মালিকরা ’টু লেট’ টাঙিয়েও আশানুরূপ ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না বলে স্বীকার করেন জয়নাল।

রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় একটি ভাড়া বাসার বাসিন্দা মকলেসুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনিও বাড়ির মালিককে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী মাস থেকে তিনি বাসা ছেড়ে দেবেন। সে অনুসারে বাড়ির মালিকও ’টু লেট’ বিজ্ঞাপন টাঙিয়েছেন।

কেন বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন জানতে চাইলে মকলেসুর রহমান বলেন, সীমিত বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। যেখানে বেতনের সিংহভাগই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। স্ত্রী আর এক সন্তান নিয়ে ওই বাসায় থাকতাম। কিন্তু বিগত দুই মাস ধরে অর্ধেক বেতন পাচ্ছি। যে কারণে বাসা ভাড়া দেয়া এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাসা ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে আমি একটি মেসে উঠবো।

এ বিষয়ে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার জাগো নিউজকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অনেকেরই আয় কমেছে। এই অবস্থায় বাসা ভাড়া পরিশোধ করা অনেকেরই জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা হলেও বাড়ি ভাড়া মওকুফ করার জন্য, কিন্তু আমাদের কথা কেউ শুনছেন না। অনেক মানুষ বেকার এবং আয় কমে যাওয়ার কারণে তাদের পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর আয়ের আশায় তিনি নিজে কোনো একটি মেসে বা কম টাকা ভাড়ার বাসায় উঠেছেন। আসলে সত্যি কথা বলতে মানুষকে খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে কারণে অনেকেই বাসা ছেড়ে দিয়েছে-দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতিতেও অনেক বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে ভাড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। যে কারণে অনেকেই বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভাড়াটিয়াদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে বাড়ির মালিকদের উচিত কিছুটা ছাড় দেয়া, কিছুটা ভাড়া মওকুফ করা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ এই সময়ে নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। অন্য এক জরিপে দেখা যায়, ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় ৫০ শতাংশ, ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাসার ভাড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর বাড়ি ভাড়া যে বেপরোয়াভাবে বেড়েছে, তাতে আয়-ব্যয়ে প্রকট অসামঞ্জস্যতা নিয়ে থাকতে হয়েছে লোকজনকে। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ায় নিরুপায় হয়ে মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন, তাতে তৈরি হচ্ছে ভাড়াটিয়া সংকট। এই সংকট সামনের দিনগুলোতে আরও প্রকট হতে পারে।


করোনভাইরাস সংক্রমন থেকে উদ্ভূত স্বাস্থ্য সঙ্কট এখন একটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দায় পড়ে বেকারত্ব বেড়ে গেছে কয়েকগুন পড়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর বিরূপ প্রভাব। বেকারত্ব এখন একটি স্বাভাবিক ফলাফল। ভাইরাসটি যখন চীনে হানা দেয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল যে বাংলাদশে সে দেশে যে আমদানী পন্য সরবরাহ সে চেইনে বিঘ্ন ঘটবে, যার ফলস্বরূপ, বিভিন্ন খাতে উৎপাদন প্রভাবিত হবে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে গেল। সংকুচিত চাহিদার কারণে এখন বাংলাদেশের রফতানি সামগ্রীর বড় বাজার যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলি মন্দার মুখোমুখি হয়ে পড়ে ফলে বাংলাদেশে পড়ে এর প্রভাব। বন্ধ হয়ে যায় অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আর বেকার হয় পরে অনেক পেশাজীবি মানুষ। দিনমজুর ও পোশাক শ্রমিকসহ স্বল্প আয়ের মানুষ খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদের আর্থিক দিকটা, কারণ দেশব্যাপী লক ডাউনের কারণে তারা তাৎক্ষণিকভাবে বেকার হয়ে পড়ে, যা চলছে এখনো।