যারা দেশের জন্য নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদেরকে রাজাকারের নামের তালিকায় প্রকাশ নিঃসন্দেহে একটি বড় অপরাধ। যা কখনও এ জাতি আশা করেনি। তবে এমনই ভুলে ভরা রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। আর তার পরপরই শুরু নানা সমালোচনার ঝড়। এরপর একপর্যায়ে তিনি মন্ত্রলায়ের ওয়েব সাইট থেকে সেই তালিকা সড়িয়ে নেন। তবে তারপরও তাকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আজ বৃহষ্পতিবার আইনি নোটিশ দেওায় হয়েছে।
এদিকে আবেদ খান খোলা চিঠি দিয়েছেন মন্ত্রীকে। সেখানে তিনি বলেন, সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে আপনার সুনাম আছে। ব্যক্তিগতভাবে আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কও সুদীর্ঘকালের। আপনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন জয়দেবপুরে, সেখান থেকে আপনার সূচনা এবং মুক্তিযুদ্ধের পূর্বলগ্নে যে প্রতিরোধ প্রথম তৈরি হয়েছিল মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিসহ জয়দেবপুরের চৌরাস্তা থেকে বিভিন্ন জায়গায়, সেখানে আপনার একটা সাহসী ভূমিকা ছিল। সেই আপনি বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে রাজাকারদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। এ তালিকার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আপনাকে এই খোলা চিঠি দিতে বাধ্য হচ্ছি। আপনি এ তালিকার ভুলভ্রান্তির ব্যাপারে বলেছেন, এতে যদি বড় কোনো ভুল থাকে, তবে এটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। আর এরই মধ্যে যেসব ভুল ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, এর জন্য আপনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

মাননীয় মন্ত্রী, একটি ভুল একটি জাতির জন্য কত নির্মম হতে পারে, সে সম্পর্কে বোধহয় আপনার কোনো ধারণা নেই। আপনি এটাকে একটি নিছক ভুল হিসেবে বলতে চাইছেন এবং এর দায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। আপনি যখন তালিকা প্রকাশের দিন-তারিখ পর্যন্ত দিয়ে দিলেন, তখন কিন্তু একবারও উল্লেখ করলেন না যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা বা অবদান আছে। আপনার এবং আপনার মন্ত্রণালয়ের এই কার্যক্রমের কারণে লাঞ্ছিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রয়াস ও প্রচেষ্টা। আর কী হয়েছে এর ফলে? স্বাধীনতাবিরোধীদের উল্লসিত করেছে আপনার মন্ত্রণালয়ের এই অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে আপনার কি উচিত ছিল না নিজে যাচাই করে দেখা? আপনার কি উচিত ছিল না রাজাকারদের তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা? এত বিশাল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য কি একটি কমিটি করা যেত না?

আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মেজর (অব.) আরেফিন বিভিন্ন জেলার রাজাকারদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছেন সরেজমিনে। এ নিয়ে কয়েক খণ্ডে পুস্তকাকারে প্রকাশও করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগের সঙ্গে আত্মিকভাবে যুক্ত থেকেছি। আমি জানি, ডা. হাসান এ ব্যাপারে কতখানি মনোযোগী ছিলেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কতখানি আন্তরিকতার সঙ্গে গণকবর অনুসন্ধান থেকে শুরু করে রাজাকারদের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজে কিংবা গণহত্যার প্রশ্নে কী নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। কই, তাদের কাউকেই তো আপনার এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখলাম না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, আপনি এককভাবে এই তালিকা প্রকাশের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের শক্তি অপদস্থ ও বিব্রত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যেখানে ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুকে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ করেছেন, তিনি স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে, আর আপনার তালিকায় তাকে রাজাকার বানানো হলো! এটা কি কোনো ছোটখাটো ভুল? এর জবাব আপনাকে দিতেই হবে।

আমি একটু বিস্মিতই হয়েছিলাম, যখন দেখলাম যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রাজাকারের তালিকা প্রকাশের ব্যাপারে সদম্ভ ঘোষণা এলো, ব্যাপকভাবে বিভিন্ন জায়গায় প্রচারিত হলো এবং পরবর্তী পর্যায়ে একটা সময়ে তারিখও নির্ধারিত হলো যে ১৫ ডিসেম্বর থেকেই রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমি এই রাজাকারের তালিকা দৈনিক জাগরণের অনলাইনে প্রকাশ করার একটা চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু কোনোভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা মন্ত্রণালয় থেকে পাইনি। রাজাকারের তালিকা যেটা প্রকাশিত হলো, সেটা আমাকে শুধু বিস্মিত নয়, অসহায় এবং শঙ্কিতও করছে। এটা কী করলেন আপনি? আপনার মন্ত্রণালয় এ কী কাজ করল? একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে আপনি প্রথম থেকে এটাকে নিজের কৃতিত্ব বলে বিবেচনা করেছেন, পরবর্তী পর্যায়ে যদি এর মর্মান্তিক পরিণতি হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমার মনে হয়, আপনার মন্ত্রণালয় কখনোই কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

একজন মন্ত্রী হয়ে যদি এমন ভুল করে তাহলে তাদের কাছ থেকে কোনো ভালো কিছু আশা করা যায় না। আজ বাঙালী জাতি সত্যিই অনেক লজ্জিত। একজন রাজাকারের নামের জায়গায় স্বজনদের দেখতে হলো শহীদদের নাম। তবে গতকাল এ ভুলের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, যাচাই-বাছাই না করে প্রকাশ করার জন্য এভুলটা হয়েছে। আমি অনেক দঃখিত।