অনেকেই শুনে স্তব্ধ হবেন যদি বলা হয় বাংলাদেশে সংসদের ভেতরে বা বাইরে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিরোধী দল নেই, যদিও ৪০টির বেশি দল নিবন্ধিত আছে নির্বাচনের কমিশনের খাতায়। ’৭১ সালে আমাদের বিজয়ের ৪৫ বছর পর, একমাত্র মাঝের নয় বছর জাতীয় পার্টির [যেটা বিএনপির আদর্শই(!) ধারণ করে] শাসন ছাড়া দেশ মূলত দুটো রাজনৈতিক দল দ্বারা শাসিত হয়েছে। সে দিক দিয়ে বলতে গেলে বাংলদেশের রাজনৈতিক মণ্ডলে আপাত দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু এ ধরনের দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার স্বপ্ন কি দেখেছিল আমাদের জনগণ এবং ত্রিশ লাখ শহীদ যাঁরা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালে?

প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত পাশ্চাত্য গণতন্ত্রে মোটামুটি দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা চালু আছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি, ক্যানাডায় রয়েছে লিবারেল ও কনজারভেটিভ পার্টি, এমনকি কংগ্রেস ও বিজেপি রয়েছে ভারতে। কিন্তু এসব গণতন্ত্রে, রাজনৈতিক দলের কেউ কি তার স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত বা যে মূল ভিত্তির উপর ভিত্তি করে তার স্বাধীনতা বা প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটা থেকে বিচ্যুত হয়েছে?

উদাহরণস্বরূপ ভারতের বর্তমান সরকার মহাত্মা গান্ধীর মর্যাদা বিন্দুমাত্র খর্ব করেনি, যদিও গান্ধীজি যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে বিভাজন-রেখা অর্থনৈতিক নীতি এবং কিছু পরিমাণে রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির উপর আবর্তিত। অনুরূপ অবস্থা কি বাংলাদেশে ‘দুই পক্ষের’ পদ্ধতিতে বিদ্যমান?

গত বছর নির্বাচনে জয়ের পর, কানাডিয়ান উদারনৈতিক দলের নেতা জাস্টিন ট্রুডো ক্ষমতা থেকে পরাজিত রক্ষণশীল দলের কথা উল্লেখ করে তাঁর বিজয় ভাষণে বলেন—

“রক্ষণশীলরা আমাদের শত্রু নয়, তারা আমাদের প্রতিবেশি।”

কেউ কি বাংলাদেশে দুই দলের নেতার কাছ থেকে এই ধরনের একটি বক্তৃতা কল্পনা করতে পারেন? আমাদের নেতাদের এই শত্রুতার পিছনের কারণসমূহের দিকে একটা সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেওয়া যাক।

এটা আমাদের মানুষের কাছে স্বাভাবিক সত্য যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র এবং সম্ভবত আমাদের ইতিহাসের একমাত্র গৌরবময় অধ্যায় ছিল। এই কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক রাতে যখন জাতির স্বাধীনতার প্রধান স্থপতিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তখন শুধু একজন মানুষকে হত্যা করা হয়নি, একইভাবে হত্যা করা হল মূল্যবোধসমূহ যার উপর ভিত্তি করে নবনির্মিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকেই শুরু হল দুঃখজনক পশ্চাৎপদ যাত্রা। পরের দুই দশক ধরে চলল বিকৃতি, ছলচাতুরি, ধ্বংস, গোমরাহি ও বৈপরীত্য; যেটা চলল সব বিএনপি আমলে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে।

বছরের পর বছর, একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারসমূহের শাসন ছাড়া, সব নন-আওয়ামী লীগ সরকারসমূহ, শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধই করেনি, আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে করেছে নির্বাসিত, যে ইতিহাস সৃষ্টির সংগ্রামে প্রায় সমগ্র জাতি কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।

প্রত্যেক জাতি তার জাতীয় ঐক্যের ভয়ানক প্রয়োজনের সময় তার ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ের স্মৃতি সামনে নিয়ে আসে। দুঃখজনকভাবে এর বিপরীতটা ঘটেছে মূলত বিএনপির ভয়ানক মিথ্যা প্রচারের কারণে। সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের আবৃত্তি হয়ে উঠেছিল সব বিএনপি সরকারের শাসনে প্রধান বিভেদ সৃষ্টিকারী উপাদান।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলা জাতিসত্তা সৃষ্টির মূল শক্তি এবং চেতনা। যদি কেউ গুরুত্বপূর্ণ নয় মাসে এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করা জন্য দেশে এবং বিদেশে যা কিছু করেছেন, সেটা তাঁর নাম আবাহন করেই করা হয়েছিল। তিনি এ জাতিকে প্রথমবারের মতো ঐক্যবদ্ধ করে ছিলেন এবং আমাদের জাতিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যেটা এর আগে কেউ পারেননি। গণহত্যা, সশস্ত্র সংগ্রাম, এবং সীমাহীন দুঃখভোগের নয় মাসে, তাঁর নাম লাখ লাখ অন্তরে রাতদিন জ্বলজ্বল করেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বই “The Blood Telegram: Nixon, Kissinger and a Forgotten Genocide”— প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যারি ব্যাস রচিত বইটি– আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি তথ্যচিত্র, প্রমাণ-দলিল। ৪০০ পৃষ্ঠার বইটির ছত্রে ছত্রে সেদিনের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কণ্ঠস্বর হিসেবে যাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে তিনি আর কেউ নন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।

এই অবস্থার মধ্যে আগুনে ঘৃতাহুতি করার মতো ঘটনা ঘটান বিএনপি নেত্রী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ১৫ আগস্টেকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিল, তখন বিএনপি নেত্রী প্রকাশ্যে ১৫ আগস্টে তাঁর কল্পিত জন্মদিন হিসেবে উদযাপন শুরু করলেন। ভাবখানা হঠাৎ যেন তাঁর পুনর্জন্ম ঘটল! একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রেসিডেন্টের বিধবা স্ত্রী হিসেবে তাঁর জন্মদিনে একাধিক নথিতে লিপিবদ্ধ ছিল, যদিও সেখানে তাঁর জন্মদিন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্‌যাপনের কোনো রেকর্ড ছিল না। একজন পাবলিক ব্যক্তিত্ব যিনি সেই সময়ে বিরোধী দলের নেতা এবং দেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাঁর পক্ষে এতটা অধম এবং মানসিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন ঘটানো এক অকল্পনীয় ব্যাপার।

গত বছর ডিসেম্বরে দেওয়া এক বক্তব্যে বিএনপি নেত্রী বললেন–

“মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। বলা হয়, এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে, আসলে কত শহীদ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, এটা নিয়েও বিতর্ক আছে। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হত না।”

গত নভেম্বরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় কোনো যুদ্ধাপরাধ বা নৃশংসতার সংগঠনের পাকিস্তান অস্বীকাররের পর পরই এসেছিল তাঁর বক্তব্য। একই বক্তব্যে তাঁর সার্বক্ষণিক দাবির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি একটি ‘আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ’ যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য তাঁর চাহিদার কথা আবারও উল্লেখে করলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার দুই মন্ত্রী এবং এক সংসদীয় উপদেষ্টা সঠিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছেন।

এর বাইরেও খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্য আরও তর্কসাপেক্ষ এ কারণে যে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত, দোষী সাব্যস্ত ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর দলের সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে শোক প্রস্তাব গ্রহণ। ইউরোপের কোনো প্রধান রাজনৈতিক দল যদি ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা কোনো যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণ করত, তাহলে ওই দল কি আইনগতভাবে টিকে থাকার অনুমতি বজায় রাখতে পারত? ওই দলে অবস্থানকারী এখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয়দানকারী মানুষদের উচিত ছিল নাকে ক্ষত দিয়ে ওই দল থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া।

ফিরে আসছি বর্তমানে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির বয়কটের (এটা ছিল নেতৃত্বের একটি আশোধনীয় রাজনৈতিক ভুল) মাধ্যমে সংঘটিত সাধারণ নির্বাচনে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কিছুটা প্রাথমিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠে আওয়ামী লীগ সরকার এখন দেশে-বিদেশে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাম্প্রতিক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শুধুমাত্র তার নৈতিক অবস্থানকে জোরদার করেছে।

তথাকথিত আন্দোলনের সময় শত শত নির্দোষ মানুষ যেভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন সে কলঙ্কের দাগ অমোচনীয় চিহ্ন হয়ে থাকবে বিএনপির শরীরে। এছাড়া রয়েছে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুদূর সম্ভাবনা দেশের মানুষের মনে এ আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে আগামী সাধারণ নির্বাচনে, যদি সেটাতে তারা অংশ নেয় এবং যেটা সংঘটিত হবে বর্তমান সরকারের অধীনে এবং সেটা সরকার যেভাবে চাইবে সেভাবেই সংঘটিত হবে। এর বাইরে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ যখন সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে তখন নাগরিকদের মনে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে আর সেটা হল বাংলাদেশ কি একটি একদলীয় রাষ্ট ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

বিএনপি ২০০৭ সালের পর থেকে ক্ষমতার বাইরে থাকার পর থেকে গত নয় বছরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। দেশের আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের অধিকাংশ ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছেন।

২০১২ সালে গণজাগরণ মঞ্চের সে উত্তাল তরঙ্গ যা কি না কেপটাউন থেকে কানাডা অবধি বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের বাঙালি সন্তানদের ধমনীতে দেশপ্রেমের বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত করছিল, যে বহ্নশিখায় জ্বলজ্বল হচ্ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আর তার অবিসংবাদিত মহানায়ক আর স্বাধীনতার আত্নাহুতি দেওয়া আমাদের ত্রিশ লাখ শহীদ।

নিজেকে আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে উপরে উল্লিখিত সত্যসমূহ বিএনপিকে উপলব্ধি করতে হবে যার ফলে দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, তার সর্বোচ্চ নেতা জাতির পিতা এবং ত্রিশ লাখ শহীদকে হৃদয়ে ধারণ করেন তারাও সমভাবে বিনাদ্বিধায় বিএনপির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে পারেন, সে মানসে বিএনপিকে আমাদের খাঁটি ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্য চিরদিনের জন্য বিতর্কের বাইরে রাখার অঙ্গীকার করতে হবে।
মোজাম্মেল খান

News Page Below Ad