খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে একজন অজ্ঞাত লেখকের বই ‘হৃৎপিণ্ড’, এটি হৃদয়ের বর্ণনাসমৃদ্ধ বিশ্বের প্রাচীন একটি বই। আর দেহে রক্ত সংবহন সম্পর্কিত সর্বপ্রাচীন ব্যাখ্যা মেলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর ‘অভ্যন্তরিক চিকিৎসাবিদ্যার নিয়ম’ নামে একটি চীনা গ্রন্থে। 
দুই হাজার বছর আগের এ দুটি গ্রন্থেই প্রাজ্ঞ লেখক বা গবেষকরা হৃৎপিণ্ড ও রক্ত সংবহন সম্পর্কিত ভালো ধারণা দিতে পেরেছিলেন। হাজার বছর আগের সমাজে গ্রন্থ প্রকাশে যান্ত্রিক কোনো উপযোগিতা ছিল না; ছিল না কাগজ; বৃক্ষপত্রে হাতের লেখাই ছিল একমাত্র ভরসা। মজার ব্যাপার হলো, কয়েক মিলেনিয়াম পার হওয়ার পরও আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক সেসব অমূল্য গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দিব্যি উদ্ধার করতে পারছি। 
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক যুগে এসে আমাদের চিকিৎসাবিশারদদের হস্তলিখিত ‘হায়ারোগ্লিফিক্স’ এর পাঠোদ্ধার করতে আমরা রীতিমতো হিমশিম খাই। কাজেই আমরা যাতে চিকিৎসকের হাতের লেখাটা অনুধাবন করে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারি, শেষমেশ এ বিষয়ে রুল জারি করতে হচ্ছে আদালতকেই। 
ডাক্তাররা অতি ব্যস্ততায় রোগীর চিকিৎসাসেবা দেন এবং তাড়াহুড়ো করে প্রেসক্রিপশন লেখেন, এটা বৈশ্বিক সমস্যা। আর এ সমস্যার জাঁতাকলে পড়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভুল চিকিৎসায় মারা যান। কিন্তু সমস্যাটি আমাদের ভারত উপমহাদেশে সবচেয়ে প্রকট। আমরা দারিদ্র্যসীমা ঘোচাতে যুদ্ধ করছি; হাজার রোগীর জন্য একজন ডাক্তারের সংকুলানও করতে পারি না। একজন ডাক্তার গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল ব্যয় হয়। জনগণের টাকাতেই সেই ব্যয়টা সংকুলান করা হয়। এমন একটা অবস্থায় বহুমূল্যবান চিকিৎসকদের হাতের লেখা প্রেসক্রিপশনের দুর্বোধ্যতার খামখেয়ালিটা রোগীদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু সাধারণ মানুষ নিজেদের রোগমুক্তির জন্য এখনো যেখানে ঝাড়ফুঁকের কুসংস্কারে ডুবে থাকেন; সেখানে বহুকষ্টে পাওয়া ডাক্তারের ভুল সেবাটা রাষ্ট্রীয় অপচয় ছাড়া কিছু না। ইদানীং সেবাটাকে পেছনে ফেলে ডাক্তারের উপার্জনের রেসের ঘোড়া এতটা বেদম ছুটছে যে তাদের দুর্বোধ্য হস্তলিপি রোগীর ভাগ্যরেখা বদলে ফেললেও কারো মধ্যে কোনো বিকার দেখা যায় না! 
তবে আশার কথা হলো, সংবাদকর্মীরা বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এনে ডাক্তারি প্রেসক্রিপশনের বোধগম্যতা বিষয়ে বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলছেন। ‘দুর্বোধ্য ব্যবস্থাপত্র : ভুল ওষুধ গ্রহণের ঝুঁকিতে রোগীরা’ শিরোনামে গত ১৭ ডিসেম্বর একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ গত সপ্তাহে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে স্পষ্ট অক্ষরে ‘পড়ার উপযোগী করে’ চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র লেখার নির্দেশনা দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ৩০ দিনের মধ্যে সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সেইসঙ্গে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের জেনেরিক নাম লিখতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সাত বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রিটকারীর আবেদন মতে, ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের দুর্বোধ্য হাতের লেখার কারণে একদিকে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে লেখা পড়তে না পেরে ফার্মেসি থেকে প্রায়ই ভুল ওষুধ গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে ব্যবস্থাপত্রে ওই নির্দিষ্ট কোম্পানির তৈরি ওষুধের নাম লেখেন। 
এখন প্রেসক্রিপশনের ওপর আদালত রুল জারি করলেও ডক্তারের হাতের লেখা হঠাৎ করে ভালো হয়ে যাবে—এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। উপার্জনের লাগামহীন ভূত সহসা তার তাণ্ডব ভুলে শান্ত-ধীরস্থির হয়ে উঠতে পারবে না। সবার আগে রুল জারি করত হবে মানুষের নৈতিকতা, বোধ ও মননে। তবে চিকিৎসকের ওপরে এটা বেশি জরুরি এ জন্য যে মানুষের জীবন সমর্পিত থাকে তার কর্মফলের ওপর। চিকিৎসকের যত্ন যেমন রোগ ভালো করে সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে, অন্যদিকে অপচিকিৎসা পরিবার-সমাজ-সংসারকে কারুণ্যে ভাসিয়ে দিতে পারে।
হাতের লেখা প্রসঙ্গে ডাক্তাররা তাঁদের পক্ষে যুক্তি দেন এভাবে, সার্জনদের হাতের লেখা খারাপ হয়, কারণ তাঁরা যে ধরনের কাঁটা-ছেড়ার মধ্যে থাকেন, যে ধরনের জটিল সব অস্ত্রোপচার করেন, সে রকম কয়েকটি অস্ত্রোপচার করার পরপর চেম্বারে ফিরে যখন ব্যবস্থাপত্র লিখতে বসেন, তখন ভালো হাতের লেখার জন্য পেশিতে যে ফাইন টিউন থাকা দরকার, তা আর থাকে না। আমরা কথাটা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু সারা দেশের সব ডাক্তারই তো কাঁটা-ছেড়ার সার্জন নয়; তার বেলা? 
কবি হোসনে আরার ‘সফদার ডাক্তারে’র চালচিত্র ও অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি। ওই পাগলা ডাক্তারের কাছে রোগী এলে তিনি খুশিতে চারবার কষে ডন আর কুস্তি দিতেন। রোগীকে ধরে গোটা দুই চাটি মারতেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে কারাগারের প্রকোষ্ঠে সফদার ডাক্তারের নিবাস নির্ধারণ করেন। 
আমরা ভালো ডাক্তারদের সমালোচনার বাইরেই রাখছি। কিন্তু তা হাতেগোনা দু-চারজন। চিকিৎসকরা স্বীকার করুন আর না করুন, সফদার ডাক্তারেই ভরে গেছে আমাদের সমাজ। প্রায় শোনা যায়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী বলে পরিচয় দেওয়া আন্ডারম্যাট্রিক এক ভুয়া ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু অর্থের ছড়াছড়ির এই যুগে কজনকে পাকড়াও করতে পারে পুলিশ? এটা গেল অক্ষরজ্ঞানহীন স্বার্থান্বেষী নির্বোধ মানুষের কাণ্ড। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক পর্যায়ের চিকিৎসক যদি অকারণে রোগীর জন্য অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখেন এবং ব্লাড, ইউরিন কিংবা আলট্রাসনোগ্রামের মতো পরীক্ষার পরামর্শ দেন; সেই অপরাধ কি পুলিশের কাছে ধরাখাওয়া সফদার ডাক্তারদের চেয়ে কোনো অংশে কম হবে? বরং নৈতিকতার মানদণ্ডে এটাই বেশি হবে। 
জেনেবুঝে কারো আর্থিক সক্ষমতার বাছবিচার না করে শুধু রোগীর পকেট কাটবার মানসে ক্লিনিক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বাজে ওষুধ খাওয়ানো নির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থার যে অশুভ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, এর মূলোৎপাটন করা এখন প্রায় অসম্ভব। অনেকেই দাবি করেন, স্বাধীন মেডিকেল কমিশন গঠন করে চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মনিটর করা হোক। কিন্তু আমরা বলব, চিকিৎসা কমিশনের শর্ষের মধ্যেই মস্ত একটা ভূত লুকায়িত থাকবেই। কার্যত সাধারণ রোগীর ভাগ্য যে তিমিরে ছিল, সেখানেই থাকবে।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ভালো করে জানেন, সিজারিয়ান বেবিরা স্বাভাবিক বেবির চেয়ে দুর্বল প্রকৃতির হয়। মাকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়, তার প্রভাব শিশু সন্তানটির ওপরও পড়ে। তার পরও জেনেবুঝে দেশের ৯০ ভাগ বেবি হচ্ছে সিজার করে। কারণ, একটাই চিকিৎসকের বাড়তি উপার্জন। এখন এই উপার্জনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার ভূতটা স্বয়ং ডাক্তারদের নিজেদের ওপরও ভর করেছে, তাই দেশের ডাক্তার মায়েরাও সহাস্যে নিজেদেরও সার্জনের টেবিলে সমর্পণ করছেন। তাঁরা বলেন, স্বাভাবিক মা হওয়ার নাকি অনেক বেদনা! যেখানে মা ও শিশুর সুস্থতার চেয়ে স্রেফ প্রসব বেদনাটা বড় হয়ে উঠল, সেখানে আর কিছু বলবার থাকে কি?
চিকিৎসা একটা সেবাধর্মী পেশা। চুন থেকে পান খসলেই চিকিৎসকরা আজকাল রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলনে নামেন। এমনকি তাঁরা জরুরি সেবা দিতেও অনীহা প্রকাশ করেন। এমন একটা অবস্থায় দেশের আপামর রোগীরা কি আর ডাক্তার সাহেবদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন। ডাক্তারের প্রতি রোগীর বিশ্বাসবোধই যদি না থাকে, তবে সেই চিকিৎসকের দেওয়া বিধানের কার্যকারিতা থাকে কতটুকু?
দেশে চিকিৎসাব্যবস্থার যে বিচ্যুতি ঘটে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণ পাওয়ার একটাই উপায়; নিজেদের বোধ, আদর্শ, নৈতিকতা ও সদিচ্ছার ওপর রুল জারি করা। কিন্তু সেই রুলটা কে জারি করবে? 
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

News Page Below Ad